গর্ভবতী মহিলাদের স্বভাবতই খুব বেশি খিদে পায় এবং সেই সময়ে সঠিক পরিমাণে ও
গুণমানের খাওয়ার খাওয়া তাঁদের জন্য খুব জরুরী। কেননা এই খাবার ও ভিটামিন
মায়ের সাথে সাথে শিশুরও শরীর গঠন ও বেড়ে ওঠায় কাজে লাগে। গর্ভবতী অবস্থায়
সব মায়েরই প্রয়োজন পড়ে সঠিক পরিমান বিশ্রাম ও খাওয়াদাওয়া ইত্যাদির। এই
সময়ে সঠিক ভাবে ওষুধ পত্র খেলে তবেই পরে গিয়ে প্রসবের সময় ও তারপর বাচ্চার
বেড়ে ওঠায় কোনোরকম জটিলতা দেখা দেয় না। প্রয়োজন নতুন মায়েদের প্রতি, আর
তাই এখানে রইল গর্ভাবস্থার জন্য নানান টিপস (pregnancy bangla).
গর্ভাবস্থায় খাবার ও ভিটামিন এর তালিকা
গর্ভবতী মহিলার সেই সময়ে কি খাওয়া প্রয়োজন তা এখানে খানিকটা বলা হল। তবে আপনার বয়স, শারীরিক অবস্থা, ওজন ইত্যাদি বিবেচনা করে ভাল ডায়েট সাজেশন অবশ্যই আপনার ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নেবেন। সকালে –
সকালে অনেক গর্ভবতী নারীরই বমি বমি ভাব হয় এবং খেতে ইচ্ছে করেনা।
সেক্ষেত্রে ভারী খাবার না খেয়ে হালকা চা (গ্রিনটি)ও বিস্কিট খেয়ে নিতে
পারেন। এর বেশ খানিকটা পরেই ২ টি রুটি ও সবজি খেতে পারেন। সাথে একটি ডিম
সিদ্ধ করে খাওয়া ভালো। বেলা ১০ টা/ ১১ টায় ১ গ্লাস ননী ছাড়া দুধ বা ফল বা
ফলের জুস ও বাদাম খেতে পারেন।
দুপুরে
দুপুরে ১ বাটি ভাতের সাথে মাছ বা মাংস, সবজির তরকারী, শাক, ডাল এবং তাজা ফল ও সবজির সালাড। খাওয়ার শেষে খেতে পারেন দই।
বিকালে
ভাজা-পোড়া খাবার না খেয়ে ঘরে তৈরি কোন
স্বাস্থ্যকর স্ন্যাক্স বা কেক বা বাদাম বা মটরশুঁটি সিদ্ধ খেতে পারেন। ফল
বা ১ গ্লাস ফলের জুস খেতে পারেন।
রাতে
রাতের
খাবার দুপুরের মতোই হবে। তবে শাক রাতে না খাওয়াই ভালো। বেশি করে সবজির
তরকারী খেতে পারেন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ১ গ্লাস ননী মুক্ত দুধ পান করতে
ভুলবেন না।
যাদের
ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্ত চাপের মত সমস্যা আছে তারা ডাক্তারের দেয়া তালিকা
অনুযায়ী খাবার খাবেন। ডায়েবেটিসের রোগীরা শর্করা ও মিষ্টি জাতীয় খাবার
এড়িয়ে যেতে হবে এবং ব্লাড প্রেশারের রুগীদের লবণ খেতে হবে কম করে।
প্রোটিন আর ভিটামিনস
প্রোটিন বা আমিষ
প্রোটিন
শরীরের গঠন ও বৃদ্ধিতে সহায়তা করে৷ গর্ভাবস্থায় মায়ের প্রোটিনে চাহিদা
স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে বেশি হয় ৷ আমিষ গর্ভের শিশুর শরীরের নতুন টিস্যু
তৈরিতে সাহায্য করে। গর্ভবতী মাকে দৈনিক অন্তত ৬০ গ্রাম আমিষ জাতীয় খাদ্য
গ্রহণ করতে হয়। প্রতিদিনের আমিষের অভাব পূরণে ২ থেকে ৩ টুকরো মাছ, ৩ থেকে ৪
টুকরো মাংস ও কমপক্ষে একটি ডিম খেতে হবে। এছাড়া নিয়ম করে প্রতিদিন
একগ্লাস উষ্ণ গরম দুধ পান করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে,
একজন গর্ভবতী মায়ের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় trimester-এ প্রতিদিন যথাক্রমে
১, ৯ ও ৩১ গ্রাম অতিরিক্ত প্রোটিন প্রয়োজন হয়।তবে খেয়াল রাখতে হবে কাঁচা
বা আধা সিদ্ধ মাংস খাওয়া যাবে না এবং ডিম ভাল করে সিদ্ধ করে বা ভেজে খেতে
হবে।আর দুধ ভাল মতো ফুটিয়ে পান করা উচিত।
ক্যালসিয়াম
গর্ভাবস্থায়
মায়ের শরীরে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি৷ গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে
শিশুর হাড় ও দাঁতের গঠনের জন্য অনেক ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন হয়৷ যদিও
গর্ভাবস্থার প্রথম থেকেই স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় তুলনামূলকভাবে
ক্যালসিয়ামের চাহিদা বেড়ে যায়, তবুও শেষের ৩ মাস চাহিদাটা সবচেয়েতে বেশি
থাকে। WHO এর মতে, একজন গর্ভবতী মায়ের দিনে ১০০০ মিলিগ্রাম এবং বিশেষ করে
শেষ ৩ মাসের প্রতিদিন ১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া দরকার।
দুধ, দুগ্ধজাত দ্রব্য, মাছ, বাদাম, কমলালেবু, শুকনো ফল, সবুজ পাতাসহ
শাক-সবজি, ফুলকপি ও তৈলবীজ খাবারে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম আছে৷
আয়রন
আমাদের
দেশের বেশির ভাগ গর্ভবতী মহিলাই রক্তাল্পতায় ভুগে থাকেন৷ গর্ভাবস্থায় মায়ের
শরীরে রক্তের চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়৷ আয়রন শরীরে হিমোগ্লোবিন ও এনার্জি
তৈরিতে সাহায্য করে, গর্ভস্থ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং
স্নায়ুতন্ত্র বিকাশ করে। Institute Of Medicine (IOM) এর মতে, গর্ভবতী
মায়ের প্রতিদিন ২৭ মিলিগ্রাম আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া দরকার।এই সময় যদি
পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন গ্রহণ করা না যায় তাহলে এনেমিয়া বা রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে৷
তাই রক্ত স্বল্পতা প্রতিরোধ করার জন্য মাকে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে৷
গরু কিংবা খাসির কলিজা, বাচ্চা মুরগি, ডিম, মাছ, কলা, কচুশাক, পালং শাক এ
সবের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে আয়রন আছে।
ভিটামিন-এ
হাড় ও
অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহের গঠনের জন্য ভিটামিন এ প্রয়োজন৷ গর্ভস্থ শিশুর
প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বেড়ে ওঠা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকর থাকা,
দৃষ্টিশক্তি সঠিকভাবে কাজ করা এবং সার্বিকভাবে বেড়ে ওঠায় ‘ভিটামিন এ’
প্রয়োজন। গর্ভে থাকা শিশু যেহেতু সব পুষ্টি মায়ের মাধ্যমেই পায়, তাই
গর্ভবতী মায়ের শরীরে ভিটামিন এ-এর এই চাহিদা পূরণ হওয়া দরকার। WHO-এর মতে,
একজন গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন ৮০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া
উচিত। সেক্ষেত্রে খাবারের তালিকায় থাকা চাই মুরগির কলিজা, ডিম, গাজর, আম,
গাঢ় কমলা ও হলুদ রঙের ফল এবং গাঢ় সবুজ রঙের শাক-সবজি।
ভিটামিন বি-১, বি-২ ও নায়াসিন:
ভিটামিন-বি
পরিবারভুক্ত ৬টি ভিটামিনের মধ্যে গর্ভাবস্থায় চাহিদা বেড়ে যায় ভিটামিন
বি-১ বা থায়ামিন, বি-২ বা রিবোফ্লাবিন ও বি-৩ বা নায়াসিনের। বি-ভিটামিন
ডায়জেস্টিভ সিস্টেমকে চালু রাখে। ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি
চামড়ার শুষ্কভাব কমিয়ে সতেজ রাখে।গর্ভাবস্থায় যেহেতু হরমোনের পরিবর্তনের
কারণে পেট, কোমর, গলা-এসব জায়গার চামড়ার রং পরিবর্তন হয়, পেটের চামড়া স্ফিত
হওয়ায় টান লাগে, তাই বি-ভিটামিন এই সময় চামড়ার দেখভালে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখে। ‘রেড মিট’, কলিজা, ডিম, কলা, কিডনি, বিনস, পালংশাক, কাঠবাদাম ও
দুধে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি পাওয়া যায়।
ভিটামিন-সি
ভিটামিন
সি এর সাহায্যে শরীর সহজেই শাকসবজি থেকে আয়রন শোষণ করে নিতে পারে,
রক্তশূন্যতার সম্ভাবনা কমায় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।এ জন্য ডাক্তার বা
পুষ্টিবিদেরা আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরপরই লেবু, কমলা, বাতাবিলেবু বা
আমলকী খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় পাওয়া যাচ্ছে
ভ্রূণের মানসিক বৃদ্ধিতে ভিটামিন-সি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভিটামিন-সি
ফলিক অ্যাসিডকে কার্যকর করে তোলার চালিকাশক্তি।গর্ভের শিশুর মাংসপেশি ও হাড়
গঠনের কোলাজেন প্রোটিনের প্রয়োজন। ভিটামিন-সি কোলাজেন তৈরিতেও সাহায্য
করে।IOM এর মতে, একজন গর্ভবতী মায়ের দিনে ৮৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি সমৃদ্ধ
খাবার খাওয়া উচিত। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন – আমলকী, পেয়ারা, কমলা
লেবু, বাতাবি লেবু, সবুজ শাক-সবজি, টমেটো এবং আলু খেতে হবে৷ মনে রাখবেন
বেশিক্ষণ রান্না করলে ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়৷
ভিটামিন-ই
ভিটামিন ই রক্ত সঞ্চালনে সাহায্য করে৷ আপেল, বাদাম, গাজর, বাঁধাকপি, ডিম, অলিভ তেল ও সূর্যমুখি বীজে ভিটামিন ই পাওয়া যায়৷
জিংক
গর্ভাবস্থার
প্রথম তিন মাস জিংক এবং ফলিক এ্যাসিডের ভূমিকা অপরিসীম। জিংক গর্ভপাত
প্রতিরোধ করে এবং শিশুর ওজন বাড়ায়৷ জিংক শরীরের প্রত্যেকটি অংশের বিভিন্ন
ধরনের কার্যক্ষমতা সক্রিয় রাখে এবং টিস্যু ও কোষ গঠনে ভূমিকা রাখে। এমনকি
গর্ভে থাকা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বেড়ে ওঠায় জিংক গুরুত্বপূর্ণ। WHO
এর মতে, গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাস ১১ মিলিগ্রাম, দ্বিতীয় ৩ মাস ১৪ মিলিগ্রাম
ও শেষের ৩ মাস ২০ মিলিগ্রাম করে জিংক সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া দরকার। এই জিংক
পাওয়া যাবে প্রানিজ প্রোটিনে৷ তাছাড়াও চিনে বাদাম, মিষ্টি কুমড়ার বীজ, গম
এসবে প্রচুর পরিমাণ জিন্ক থাকে যা আপনার গর্ভাবস্থায় চাহিদা পূরণে সক্ষম৷
আয়োডিন
গর্ভাবস্থায়
আয়োডিনের অভাব হলে গর্ভে থাকা সময় থেকে শুরু করে জন্মের ৩ মাস বয়স পর্যন্ত
শিশুর বুদ্ধির বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। এছাড়াও আয়োডিনের অভাবে গর্ভে থাকা
শিশুর মৃত্যুর সম্ভাবনাও থাকে। এটি থাইরয়েডকেও সুস্থ রাখে।
তাই গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম আয়োডিনযুক্ত খাবার খাওয়ার
পরামর্শ দিয়েছে WHO। আয়োডিন যুক্ত খাবারের মাঝে আছে আয়োডিনযুক্ত লবণ,
সামুদ্রিক মাছ, পনির, টক দই, গরুর দুধ ইত্যাদি।
ভিটামিন ট্যাবলেট
গর্ভাবস্থায়
শরীরে অতিরিক্ত ভিটামিনের প্রয়োজন হয়৷ এই অতিরিক্ত ভিটামিনের চাহিদা
খাবারের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব না হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী
ভিটামিন ট্যাবলেট গ্রহণ করতে হবে৷
জল
রোজ প্রচুর পরিমানে জল পান করতে হবে। জল শরীরে রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে। রক্তের মাধ্যমে বাচ্চার শরীরে পুষ্টি পৌঁছায়। এছাড়া জল মূত্র থলির প্রদাহ ও অতিরিক্ত ঘাম রোধ করে।জলের সঙ্গে বিভিন্ন সুপ, টাটকা ফলের রসও খাওয়া যেতে পারে।
শেষ কথা
সঠিক পরিমান পুষ্টি ও ভিটামিন সকল
গর্ভবতীদের জন্য অত্যন্ত দরকার। ভিটামিনের অভাবে আমাদের অনেক সময় বাচাদের
সু সাস্থ হয়ে ওঠেনা বা জন্মানোর সময় বা জন্মানোর পর দেখা যায়
বাচ্চারা বিকলাঙ্গ হয় বা অন্য কিছু সমস্যা দেখা যায়। উল্লেখিত জিনিস গুলো
মেনে চললে আশা করা যায় আপনি আর আপনার বাচ্চা সুস্থই থাকবেন। কিন্তু এর থেকে
অধিক জানার জন্য বা আপনি সরাসরি ডাক্তারের সাথে কথাও বলতে পারেন এই সকল
বিষয় নিয়ে। ভালো থাকবেন আর সুস্থ থাকবেন।